জনসাধারণ কি জনপ্রতিনিধিদের ওপর আস্থা হারাচ্ছে?

আমার ধারণা, বর্তমানের করোনা ভাইরাস আমাদের রাজনৈতিক নেতা ও নেতৃত্বের জন্যও একটা ভয়ানক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ রাজনীতিকরা, বিশেষ করে শাসক দল মোকাবিলা করতে না পারলে তাদের উপর মানুষের যে আস্থার অভাব দেখা দিয়েছে, না সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপরেই বর্তাবে।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের বিপর্যয় দেখা দেওয়ার পূর্বাভাস পেতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ঘরে আবদ্ধ থাকায় যেসব পরিবার খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাবে পড়েছে, তাদের জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা করেছেন। ১০ টাকা কেজি দরে চাউল বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন। দুস্থদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন। শুধু সরকার নন, বেসরকারি সাহায্যও এক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে।

কিন্তু একটি বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অনেকের যে বক্তব্য দেখছি, তা হলো দেশে মানুষের দুর্দশা দূর করার জন্য শেখ হাসিনার প্রতি তারা কৃতজ্ঞ, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের সানুনয় আবেদন, ত্রাণসামগ্রী ও খাদ্যশস্য যেন মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, এমপি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে বিতরণ না করে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে করা হয়। তাহলে তারা সাহায্যদ্রব্যগুলো ঠিকমতো পাবেন। নইলে সরকারি সাহায্য দুর্নীতিবাজ আমলা-পৈলাদের পেটে যাবে।

প্রথমে এই আবেদনগুলোকে তেমন পাত্তা দেইনি। ভেবেছি, সরকারের বিরোধীদের কোনো কারসাজি। তার পর এই আবেদনের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পর ঠিক করলাম, এই করোনা ভাইরাসের দুর্যোগের মধ্যেও ঢাকার বন্ধুবান্ধবদের কাছে টেলিফোন করে জানতে চাইব সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত এই আবেদনের গুরুত্ব কতটুকু?

তারা এক বাক্যে বললেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সামরিক বাহিনীর দ্বারা সাহায্যদ্রব্য বিতরণের যে আবেদন প্রচারিত হয়েছে, সেটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রায় সকলের মনের কথা। বন্ধুদের কাছে যাদের মধ্যে তিন জন সাংবাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন অধ্যাপক, তিন জন হাইস্কুল শিক্ষক রয়েছেন, তারা সকলেই বললেন, এই দারুণ বিপদে দেশের সর্বস্তরের মানুষের শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা ও নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু তার দল, মন্ত্রী ও উপমন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যানদের অনেকের সততা ও দক্ষতার প্রতি মানুষের কোনো আস্থা নেই।

এদের মধ্যে সত্ মানুষ যে নেই তা নয়। তাদের সংখ্যা কম। সংখ্যাগরিষ্ঠদের অপকর্ম তাদের সততা ও সুনামকেও ঢেকে ফেলেছে। এখন আওয়ামী লীগের সমর্থক বেশির ভাগ মানুষও চায় সেনাবাহিনীর হাতে সাহায্যদ্রব্য বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হোক।

আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে, যে দেশের মানুষ একবার নয় কয়েকবার দেশে সামরিক শাসন উচ্ছেদের জন্য আন্দোলন করেছে, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে, এবং এই দাবি আদায়ের জন্য রক্ত দিয়েছে, তারা এতো শিগিগরই কীভাবে সব ভুলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বদলে সেনাবাহিনীর প্রতি অধিক আস্থা জানায়?

আমার এই বিস্ময় অপনোদন করেছেন এবং প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন, অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন আমার এক তরুণ বন্ধু মাহবুব উল্লাহ। টেলিফোনে আমাদের মধ্যে আলাপ হচ্ছিল (করোনার কারণে গৃহবন্দি অবস্থায় টেলিফোনে কথা বলা ছাড়া আর কি করব)।

তিনি বললেন, বাংলাদেশের মানুষ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের প্রতি আস্থা হারায়নি, কিংবা সেনা শাসনও চায় না। তারা আস্থা হারিয়েছে বর্তমানের একদল জনপ্রতিনিধির উপর। এই জনপ্রতিনিধিরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই দলেরই। অতীতে বিএনপির আরো বেশি লুটপাট তারা দেখেছে এখন দেখছে আওয়ামী লীগারদের লুটপাট।

মাহবুব উল্লাহ বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাতের খুবই ভক্ত। বললেন, তার সব বই তিনি পড়েছেন এবং দেশের সমস্যাগুলো সনাক্ত করতে শিখেছেন। সেদিন আমাদের আলোচনার বিষয়টি প্রসঙ্গে বললেন, দেশের মানুষ সেনাশাসন চায় না। কিন্তু দেশের তরুণ সেনাবাহিনীকে ভালোবাসে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সময় তাদের সাহস, সততা তারা দেখেছে। বহির্বিশ্বে তাদের শান্তিরক্ষকের ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। দেশের পুরোনো পাকিস্তান আমলের সেনা অফিসারদের ক্ষমতালোভ ও দুর্নীতি গোটা সেনাবাহিনীর সুনাম নষ্ট করেছিল। সেনাবাহিনীর বর্তমান তারুণ্য সেই সুনাম পুনরুদ্ধার করেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দুই দলই দেশে গজিয়ে হঠাত্ অসত্ ও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের মাঝে থেকে বেছে বেছে সংসদ, উপজেলা থেকে নির্বাচনের সর্ব পর্যায়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরো অসত্ ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ায় মানুষ শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে বিশ্বাস করে তাদের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে।

কিন্তু প্রতারিত হয়েছে। দেশের মানুষ বিএনপি আমলে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের একটি বিরাট হাওয়া ভবন গড়ে উঠতে দেখেছে। আর আওয়ামী লীগ আমলে দেখছে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির ১ কোটি ছোটো ছোটো হাওয়া ভবন গড়ে উঠতে।
দেশের মানুষ ভোট দিয়ে খারাপ মানুষ সংসদে সিটি করপোরেশনে বা উপজেলা পরিষদে পাঠায়নি। পাঠিয়েছে দুটি বড়ো রাজনৈতিক দল। চরিত্র বিচার না করে টাকার জোর দেখে বেশির ভাগ অসত্ ব্যবসায়ীকে নমিনেশন দিয়েছে। এদেরই অধিকাংশ এখন মন্ত্রী, এমপি, উপজেলা প্রধান হয়ে গরিবের হক মেরে খাচ্ছে।

এরা প্রকৃত রাজনীতিবিদ নন। প্রকৃত রাজনীতিকেরা কিছুসংখ্যক বাদে অধিকাংশই অর্থবিত্ত নেই বলে তাদের দলের মনোনয়ন পায় না। ফলে বিএনপি আমলে যেমন প্রকৃত রাজনীতিকেরা দেশ শাসন করেনি তেমনি আওয়ামী লীগ আমলেও করছে না। দুই জোটেরই শাসন আমলে দেশ শাসন করেছে এবং করছে একদল দুর্নীতিবাদ ব্যবসায়ী। (আমি খুবই সংখ্যালঘিষ্ঠ কিছু মন্ত্রী, এমপিদের এদের অন্তর্ভুক্ত করছি না)।

এই দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী, এমপিদের সহযোগী হলো আমলতন্ত্রের আরো দুর্নীতিবাজ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এই দুর্নীতিবাজদের অতীতে সীমাহীন দুর্নীতির একটি মাত্র উদাহরণ দেই। আমি তখন ঢাকায়। প্রতি কোরবানির ঈদে সৌদি আরবে লাখ লাখ উট, দুম্বা, গরু, ভেড়া কোরবানি হয়। এই লাখ লাখ টন মাংস খাওয়ার লোক সে দেশে নেই। তাই তখনকার সৌদি বাদশাহ ঠিক করলেন এই মাংস প্যাকেট করে কয়েকটি মিত্র মুসলমান দেশে পাঠাবেন গরিবদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য। এটা দেশের স্বৈরাচারী শাসন আমল। দেখা গেল সৌদি আরব থেকে পাঠানো মাংসের প্যাকেটের এক প্যাকেটও বাংলাদেশের গরিবদের ভাগ্যে জোটেনি। ‘পবিত্র মক্কার পবিত্র মাংস’ ছাপ মেরে বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।

এবার এই আওয়ালী লীগ আমলে শেখ হাসিনা অতন্ত্র প্রহরীর মতো দেশ শাসন করা সত্ত্বেও কোনো এক এলাকার দুই জন আওয়ামী লীগের নেতা করোনা দুর্যোগের রিলিফ চুরির ব্যাপারে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন।

এই করোনা ভাইরাসের আগে সরকার যখন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ১৬ টাকা কেজি দরে চাউল বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলেন, তখন কয়জন মন্ত্রী, এমপি বা উপজেলা চেয়ারম্যান তা নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে তুলে নিয়েছেন? বরং তাও অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে মুনাফার বাণিজ্য করা হয়েছে। সরকার নিম্ন শ্রেণীর লাখ লাখ গরিব ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিনা মূল্যে পাঠ্য বই বিতরণের জন্য দিয়েছেন। তা যথাসময়ে স্কুলে পৌঁছেনি, ছাত্রছাত্রীদের তা উচ্চ মূল্যে কিনতে হয়েছে এমন উদাহরণও আছে।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের নিজেদের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমানের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধির ওপর আস্থা হারিয়েছে। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনের এবং গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপরেই তারা আস্থা হারাবে। তখন হায় গণতন্ত্র, হায় গণতন্ত্র বলে মাতম জুড়লেও কোনো লাভ হবে না। কপাল ভালো, আমাদের বর্তমান সেনাবাহিনী স্মার্ট, ইয়ং এবং পেট্রিয়ট। বিশ্বের সর্বাধিক দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভী সেনাবাহিনী হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

এই সেনাবাহিনী থেকে পাকিস্তানি মনোভাব নিয়ে যে দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভী বাংলাদেশি সিনিয়র অফিসার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে এসেছিলেন, জিয়া-এরশাদ-মইনুদ্দিনের সঙ্গে তাদের জমানা শেষ হয়েছে। বর্তমানের সেনাবাহিনী পাকিস্তানি চেতনা ও আচার আচরণ দ্বারা প্রভাবিত নয়। তারা তরুণ, অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দীক্ষিত। দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষা করা তাদের কাছে পবিত্র আমানত।

আমাদের বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের একটা বড়ো অংশ যেন তাদের অসত্ চরিত্র ও কর্মকাণ্ড দ্বারা প্রকৃত রাজনীতিক ও রাজনীতির উপর কলঙ্কের বোঝা না চাপান এবং জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট না করেন। তা না হলে তারা শুধু দেশের সর্বনাশ ঘটাবেন না, নিজেদেরও সর্বনাশ ঘটাবেন। করোনার মহাধ্বংসকর শক্তি যদি বেছে বেছে এবার এদের ধ্বংস ঘটাত, তাহলে দেশ জঞ্জালমুক্ত হতো।